ধর্ম

জাকাত গরীবের অধিকার

  • 12:05 pm - March 11, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৪ বার

জাকাত একটি ফরজ ইবাদত এবং গরিবের হক। আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত যত হক আছে‌ তা পূর্ণভাবে আল্লাহ তায়ালাই দেখবেন। তিনি চাইলে ক্ষমা করতে পারেন, চাইলে শাস্তিও দিতে পারেন। কিন্তু বান্দার হক আল্লাহর কাছে ক্ষমা হয় না; এটি বান্দার উপরই ছেড়ে দেওয়া হয়।

আল্লাহ তাআলা কুরআনে একাধিক স্থানে সালাত ও জাকাতকে একসাথে উল্লেখ করেছেন—যা জাকাতের গুরুত্বকে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরে। জাকাত দেওয়া মানে করুনা করা না; এটি সম্পদকে পবিত্র করার মাধ্যম এবং সমাজকে দারিদ্র্য মুক্ত করার কার্যকর ব্যবস্থা। আল্লাহ তাআলা বলেন, তাদের ধন-সম্পদে রয়েছে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতের হক। (সুরা যারিয়াত ১৯)

আপনার সম্পদের উপর অসহায় ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে। তাই যখন আপনি জাকাত দেন,এটা মনে করবেন না যে আপনি কোনো বড় কাজ করেছেন। এটি গরিবের অধিকার। আপনি গরিবকে তার প্রাপ্য দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা আমাদের অতিরিক্ত সম্পদ দেন—যেমন গাছের মাধ্যমে ফল, ক্ষেতের মাধ্যমে ফসল, নদীর মাধ্যমে পানি। অতিরিক্ত সম্পদের এই অংশটি অন্যের হক হিসেবে যথাযথ সময়ে পৌঁছে দেওয়া আমাদের দায়িত্ব।

আল্লাহ তাআলা প্রকৃত মুমিনের গুণাবলী বর্ণনা করেছেন, প্রকৃতভাবে ঈমানদার কেবল সেই ব্যক্তিরা, যারা তাদের প্রদানকৃত সম্পদ থেকে আল্লাহর পথে ব্যয় করে। এরা প্রকৃতভাবে ঈমানদার। (সুরা আনফাল এর প্রাসঙ্গিক অংশ)

রসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের উপর প্রতিষ্ঠিত, তার একটি হলো সম্পদ থেকে জাকাত আদায় করা। (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম) গরীবের সম্মান মসজিদের সমান

ইসলামে প্রতিটি ফরজ ইবাদতের নিজস্ব মর্যাদা, শিষ্টাচার ও আদব রয়েছে। আল্লাহ তাআলা যে ইবাদতকে ফরজ করেছেন, সেই ইবাদত আদায়ের ক্ষেত্রও সম্মানিত এবং বান্দার আচরণও হতে হয় ভদ্র, বিনয়ী ও সচেতন।

যেমন, নামাজ একটি ফরজ ইবাদত। এই ইবাদত আদায়ের জন্য নির্ধারিত স্থান হচ্ছে মসজিদ, যা একটি পবিত্র স্থান। সেখানে মানুষ উচ্চৈঃস্বরে কথা বলে না, হাসি-ঠাট্টা করে না। বরং নম্রতা, ভদ্রতা ও শ্রদ্ধা বজায় রাখে। নামাজ আদায়ের সময়ও আমাদের চোখ, কান, জবান সবকিছু আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করতে হয়। খুশু-খুজুর সাথে দাঁড়াতে হয় এবং বিনয়ের সাথে আল্লাহর সামনে আমাদের নিজেকে প্রমাণ করতে হয়।

যেমনভাবে হজ্বও একটি ফরজ ইবাদত। হজ্বের জন্য মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে বাইতুল্লাহর উদ্দেশ্যে আসে। যাওয়ার আগে আত্মিক, শারীরিক ও আর্থিকভাবে প্রস্তুতি নেয়। সেখানে গিয়ে মানুষ সতর্ক থাকে যেন কোনো কথা বা আচরণ আল্লাহর দরবারে বেয়াদবি হয়ে না যায়। হজ্ব শেষে মানুষ চেষ্টা করে নিজেকে নিষ্পাপ ও পরিশুদ্ধ করে ফিরে আসে।

রোজাও একটি ফরজ ইবাদত। সারাদিন ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করতে হয়। নিজের নফস নিয়ন্ত্রণে রাখা, চোখ, জবান, আচরণ সবকিছু সংযত রাখা, এটি রোজার একটি মূল শিক্ষার অংশ। মানুষ চেষ্টা করে যেন এমন কোনো কাজ না হয় যা তার রোজার সওয়াব বা কার্যকারিতা হ্রাস করে।

এভাবে আমরা দেখি—প্রতিটি ফরজ ইবাদতের ক্ষেত্রে মানুষ অত্যন্ত সতর্ক, সচেতন ও সম্মানজনক আচরণ করে। কিন্তু যখন যাকাতের কথা আসে, অনেক সময় আমরা সেই সম্মান দেখাতে পারি না। অথচ যাকাতও একটি ফরজ ইবাদত।

আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমরা কখনো পূর্ণ কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা তোমাদের প্রিয় বস্তু থেকে ব্যয় করো। (সুরা আল-ইমরান ৩:৯২)

রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে নিজের জন্য যা ভালোবাসে, তার ভাইয়ের জন্যও তাই ভালোবাসে। (সহিহ বুখারি ২, সহিহ মুসলিম ৬৬২) আরেকটি হাদিসে এসেছে, যে জিনিস তুমি নিজের জন্য পছন্দ কর, তা তোমার মুমিন ভাইয়ের জন্যও পছন্দ কর। (সহিহ মুসলিম, ৬৬১)

দুঃখজনকভাবে, বাস্তবে অনেক সময় আমরা গরিব মানুষকে হেয় করি। জাকাত দেওয়ার সময় অনেকেই এমন কাপড় বা জিনিস দেন যা একবার ধোয়ার পরই আর ব্যবহারযোগ্য থাকে না। ইসলামে দরিদ্র মানুষকে সম্মান দিয়ে যা দেওয়া হয়, তা তার মর্যাদা রক্ষা করে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, যেমন মসজিদ, বাইতুল্লাহ, রোজা ও হজ সম্মানিত, তেমনি গরিব মানুষও সম্মানিত। যখন আমরা জাকাত দেই, তখন আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করতে হবে, আমি কি নিজে এই জিনিস ব্যবহার করতে পারব? আমি কি আমার পরিবারের কাউকে এটি দিতে পারব? যদি উত্তর ‘না’ হয়, তবে অন্যকে দেওয়াও উচিত নয়। বরং চেষ্টা করা উচিত, যে কাপড় বা জিনিসটি দিলাম, তা অন্তত আগামী রমজান পর্যন্ত ব্যবহারযোগ্য হোক।

জাকাত আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সম্পদের আসল বৃদ্ধি
অনেকে মানবিক স্বার্থ বা বেশি পাওয়ার আশায় ‘সুদ’ বা উপহার দিয়ে থাকে। তারা মনে করে এতে আমার সম্পদ বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু প্রকৃত আল্লাহর দৃষ্টিতে আসলে বৃদ্ধি পায় না। বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে জাকাত দিলে তা বরকতপ্রাপ্ত হয় এবং দাতার ধন-সম্পদ ও আধ্যাত্মিকভাবে বৃদ্ধি পায়।

আল্লাহ তাআলা বলেন, আর মানুষের সম্পদ বৃদ্ধি পাবে বলে তোমরা যে সুদ দাও, আল্লাহর দৃষ্টিতে তা ধন-সম্পদ বৃদ্ধি করে না। কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য যে জাকাত তোমরা দাও, তা-ই বৃদ্ধি পায়। সুতরাং তারাই সমৃদ্ধিশালী। (সুরা রুম: ৩৯)

সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, হালাল উপার্জন থেকে একটি খেজুর সমতুল্য দান বৃদ্ধি পেয়ে উহুদ পর্বতের সমান হয়ে যায়। (সহিহ মুসলিম, কিতাবুয জাকাত)

জাকাত হলো এক ধরনের আধ্যাত্মিক বিনিয়োগ। এটি কেবল দরিদ্রদের সাহায্য নয়, বরং দাতার জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং আখেরাতের বহু প্রতিদান লাভের মাধ্যম। যে ব্যক্তি তার সম্পদ আল্লাহর পথে আন্তরিকভাবে ব্যয় করবে, আল্লাহ তাকে অসীমভাবে পুরস্কৃত করবেন।

জাকাত আদায় না করার শাস্তি
জাকাত ফরজ হওয়ার পর ইচ্ছাকৃতভাবে না দিলে এটি বড় গুনাহ। কেয়ামতের দিন শাস্তি হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, যারা স্বর্ণ-রৌপ্য সঞ্চয় করে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দাও। সেদিন সেগুলো জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করা হবে এবং তা দিয়ে তাদের কপাল, পার্শ্ব ও পিঠে দাগ দেওয়া হবে। এটাই তোমরা নিজেদের জন্য সঞ্চয় করেছিলে; এখন তার স্বাদ গ্রহণ করো। (সুরা আত-তাওবা ৯:৩৪–৩৫)

রসুলুল্লাহ সা. বলেন, যাকে আল্লাহ সম্পদ দিয়েছেন, অথচ সে তার যাকাত আদায় করেনি, কেয়ামতের দিন তার সম্পদ বিষধর সাপের রূপ নিয়ে তার গলায় পেঁচিয়ে ধরা হবে এবং তাকে দংশন করবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৪০৩)

আরেকটি হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি উট, গরু বা ছাগলের যাকাত আদায় করবে না, কিয়ামতের দিন সেগুলো আগের চেয়ে মোটা ও শক্ত হয়ে এসে তাকে শিং ও খুর দিয়ে আঘাত করবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৯৮৭)

সুতরাং জাকাত ইসলামের একটি ফরজ বিধান। এই মহান ইবাদতকে জরিমানা মনে না করি। সঠিক হিসাব করে, সময়মতো হকদারের কাছে আদায় করা অত্যন্ত জরুরি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে তৌফিক দান করুন। আমিন।

চাঁপাইবার্তা/এসটি/মুফতি জালাল উদ্দিন জামালী।।

এই শাখার আরও খবর

ঈদুল ফিতরের প্রধান জামাত সকাল সাড়ে ৮টায়

আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আসন্ন ঈদুল ফিতরের নামাজের প্রধান জামাত জাতীয় ঈদগাহে সকাল সাড়ে ৮টায় অনুষ্ঠিত হবে। তবে আবহাওয়া প্রতিকূল বা গোলযোগপূর্ণ হলে ঈদের প্রধান জামাত…

আত্মহত্যাকে মহাপাপ বলা হয় কেন?

আত্মহত্যা ইসলামে মহাপাপ হিসেবে গণ্য, এমনকি অনেক বড় গুনাহের চেয়েও এটি ভয়াবহ। ইসলামে আত্মহত্যা মহাপাপ। কোরআনে আল্লাহ আত্মহত্যা করতে নিষেধ করে বলা হয়েছে, তোমরা নিজেরা…

ইতিকাফে বসার আগে যে মাসআলাগুলো জানা জরুরি

রমজান মাসের শেষ দশকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম হলো ইতিকাফ। আরবি শব্দ ইতিকাফের অর্থ কোনো স্থানে অবস্থান করা বা নিজেকে সেখানে সীমাবদ্ধ রাখা। শরিয়তের…

স্বত্ব © চাঁপাইবার্তা.কম - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @Softs Cloud