চাঁপাইনবাবগঞ্জ | বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬ - ৪:৪৬ এ.এম

আশ্বিনেও মিষ্টি আম, কেমিক্যালের প্রভাব নাকি আসলেই চমৎকার?

  • 4:59 pm - September 23, 2026

‘বাবা দেখ, মা দেখ, আমগুলো কী সুন্দর! আমাকে কিনে দাও না, আমি দুধ দিয়ে খাব’—মেয়ের মুখে এমন আবদারের কথা শুনে বাবা আমের দোকানের সামনে মোটরসাইকেল দাঁড় করাতেই মা আতঙ্কিত কণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘না না, এখন আমের সিজিন নয়; এই আম খাওয়া যাবে না। আমগুলোতে ফরমালিন দেওয়া। খেলে পেটের সমস্যা হবে।’

কথাগুলো বলছিলেন দিনাজপুর সদর উপজেলার মুরাদপুর গ্রামের সাবিনা ইয়াসমিন। কাটিমন আম সম্পর্কে ধারণা না থাকায় শেষ পর্যন্ত মেয়ের আবদার না মিটিয়েই চলে যেতে হয় বাবাকে।

‘বাজারে কাটিমন, বারি-৪, গৌড়মতি ও আশ্বিনা জাতের আম রয়েছে। বর্তমানে এই আমগুলোর মৌসুম চলছে। এই আমে মেডিসিন দেওয়া আছে এমন একটি ধারণা ক্রেতার মধ্যে ছড়িয়ে আছে। আসলে এটা সঠিক নয়। আবার অনেকে আছেন তারা জানেন না যে, ভাদ্র মাসে তালের মৌসুমে এই আমগুলো পাওয়া যায়। তাই অনেকের প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। বোঝাতে হয়। তারপরও অনেকে বোঝেন অনেকে বোঝেন না। তাই এই আমগুলোর বিক্রি কম। তা নাহলে বাজারে যে দামে আম বিক্রি হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি দামে আম বিক্রি হতো’

সম্প্রতি এমনই ঘটনা ঘটে দিনাজপুর গোর-এ শহীদ ময়দানে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে। সেখানে প্রাচীর ঘেঁষে ভ্যানে করে সারিবদ্ধ হয়ে হলুদ রঙের কাটিমন আম বিক্রি করছিলেন একজন বিক্রেতা।

আমের মৌসুম শেষের পথে। দিনাজপুরে নাবি জাতের আম খুব একটা চাষ হয় না। কিন্তু দিনাজপুরের বাজারে এখন প্রচুর আম পাওয়া যাচ্ছে। দাম বেশ চড়া। প্রতিকেজি আম বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২২০ টাকা কেজি দরে। আর হলুদ রঙের কাটিমন জাতের এই আমগুলো দিনাজপুরের বাজারে আসছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ উপজেলা থেকে। কাটিমন, বারি-৪, গৌড়মতি ও আশ্বিনা—এই চার জাতের আম দেখা গেলেও দিনাজপুরে কাটিমন আম সব ফলের দোকানসহ ভাসমান দোকানেও পাওয়া যাচ্ছে।
বিজ্ঞাপন

শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সদর উপজেলার মুরাদপুর গ্রামের মোমিনুল ইসলাম ও সাবিনা ইয়াসমিন দম্পতি বেড়াতে এসেছিলেন। তাদের সঙ্গে ছিল প্রাইমারি স্কুলে পড়ুয়া মেয়ে। শহরের গোর-এ শহীদ ময়দানে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে ভ্যানে করে আম নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা হলুদ রঙের কাটিমন আম দেখে মেয়ে বায়না ধরে আম কিনে দেওয়ার জন্য। কিন্তু মা সাবিনা ইয়াসমিন আম কিনে দিতে রাজি হননি। তার ধারণা, আমগুলোতে প্রচুর পরিমাণে ফরমালিন দেওয়া আছে। তা নাহলে এত দিন তো আম থাকার কথা নয়। কারণ এটা আমের মৌসুম নয়। দোকানদারও তাকে বোঝাতে পারেননি যে, এটা কাটিমন আম। আর এখন কাটিমন আমের মৌসুম চলছে।

‘এখন কাটিমন আমের মৌসুম চলছে। কাটিমন আম প্রাকৃতিকভাবেই দীর্ঘদিন শক্ত ও সতেজ থাকে। কারণ এই জাতের আমে পানির পরিমাণ কম এবং আঁশ ও শাঁস বেশ ঘন হয়। তাই দীর্ঘদিন কেমিক্যাল ছাড়াই ভালো থাকে’

এই দম্পতি চলে গেলে আমের দোকানদার জানান, কাটিমন আমের বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা না থাকায় এবং ফরমালিনের ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে অনেক ক্রেতাই ইচ্ছা থাকলেও আম কিনছেন না।

কথা হয় ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ থেকে কাটিমন আম নিয়ে দিনাজপুরে আসা বাগান মালিক খুরশেদ আলমের সঙ্গে। তিনি ২৩ একর জমিতে কাটিমন আমের চাষ করেছেন। ১৪ মন আম নিয়ে দিনাজপুরে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘কাটিমন আম বর্তমান সময়ের আম। এ আম কোনো কীটনাশক বা ফরমালিন ছাড়াই গাছ থেকে নামানোর পর ১৫-২০ দিন স্বাভাবিক থাকে। কাজেই এই আমে ফরমালিন বা ক্ষতিকর কীটনাশক দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। তবে অনেকে আতঙ্কিত হয়ে এই আম কিনতে বা খেতে চান না। তারা আসলে ভ্রান্ত ধারণার মধ্যে রয়েছেন।’

বাহাদুর বাজারের ফল ব্যবসায়ী সোহেল রানা, লিটন হোসেন ও রানা বলেন, ‘বাজারে কাটিমন, বারি-৪, গৌড়মতি ও আশ্বিনা জাতের আম রয়েছে। বর্তমানে এই আমগুলোর মৌসুম চলছে। এই আমে মেডিসিন দেওয়া আছে এমন একটি ধারণা ক্রেতার মধ্যে ছড়িয়ে আছে। আসলে এটা সঠিক নয়। আবার অনেকে আছেন তারা জানেন না যে, আশ্বিন মাসেও তালের মৌসুমে এই আমগুলো পাওয়া যায়। তাই অনেকের প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। বোঝাতে হয়। তারপরও অনেকে বোঝেন অনেকে বোঝেন না। তাই এই আমগুলোর বিক্রি কম। তা নাহলে বাজারে যে দামে আম বিক্রি হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি দামে আম বিক্রি হতো।’

দিনাজপুর জেলা ক্যাবের প্রচার সম্পাদক মাসউদ রানা বলেন, ‘এখন কাটিমন আমের মৌসুম চলছে। কাটিমন আম প্রাকৃতিকভাবেই দীর্ঘদিন শক্ত ও সতেজ থাকে। কারণ এই জাতের আমে পানির পরিমাণ কম এবং আঁশ ও শাঁস বেশ ঘন হয়। তাই দীর্ঘদিন কেমিক্যাল ছাড়াই ভালো থাকে। তবে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী দ্রুত পাকাতে বা দীর্ঘক্ষণ সংরক্ষণের জন্য ক্যালসিয়াম কার্বাইড বা অন্যান্য প্রিজারভেটিভ ব্যবহার করতে পারে। তবে ফরমালিন প্রাকৃতিক ও তাজা ফলমূলে কৃত্রিমভাবে দেওয়া হলে তা থাকে না। তাজা শাকসবজি, ফলমূলে প্রাকৃতিকভাবে নিজস্ব ফরমালডিহাইড তৈরি করে শাকসবজি, ফলমূলকে সতেজ রাখতে পারে। অনেকে মৌমাছির মম চায়না প্রযুক্তির মাধ্যমে ফলের ওপর স্প্রে করে একটি আবরণ তৈরি করে দীর্ঘসময় ফলমূলকে ভালো রাখতে পারেন। কাজেই আম নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।’

হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) কৃষি অনুষদের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. হাসানুর রহমান রাজুও জানান, এখন কাটিমন, বারি-৪, গৌড়মতি ও আশ্বিনা আমের ভরা মৌসুম চলছে।

তিনি বলেন, ‘আমগুলো অন্য জেলা থেকে আসায় দিনাজপুরের মানুষ এই আমের সঙ্গে তেমন পরিচিত নয়। তারপরও দিনাজপুরে সবচেয়ে বেশি পাওয়া যাচ্ছে কাটিমন আম। হলুদ রং, দেখতে সুন্দর হওয়ায় খুব সহজেই মানুষকে আকৃষ্ট করে। এ আমের আঁশ ও শাঁস বেশ ঘন। সে কারণে এমনিতেই অনেক দিন ভালো থাকে। গাছ থেকে পাড়ার পরও ২০-২৫ দিন পর্যন্ত কিছু হয় না।’

কাটিমন খাওয়ার বিষয়ে আতঙ্কিত না হয়ে হাবিপ্রবির এই সহযোগী অধ্যাপক বলেন, ‘কোনো প্রকার সংশয় ছাড়াই এই আম সবাই খাবেন। স্বাদ বেশি পেতে একটু শক্ত থাকা অবস্থাতেই খাবেন।’
বিজ্ঞাপন

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় অবস্থিত আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শরফ উদ্দিন বলেন, ‘এই আমগুলো সাধারণত ব্যাগিং পদ্ধতি চাষ করা হয়। কাজেই স্প্রে বা কীটনাশক দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। তাছাড়া এই আমগুলোর আঁশ ও শাঁস বেশ ঘন। পানি কম থাকায় অনেকদিন এমনিতেই সংরক্ষণ করা যায়। এগুলো বিষমুক্ত আম, যে কেউ খেতে পারেন। সেই সঙ্গে পরিপক্ব আম খেতে হলে বড় সাইজের আম কিনবেন। ছোট আম অনেক সময় অপরিপক্ব হতে পারে।’

চাঁপাইবার্তা/জেএন।।

স্বত্ব © চাঁপাইবার্তা.কম - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @Softs Cloud