চাঁপাইনবাবগঞ্জ | বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১৫, ২০২৬ - ৪:০৬ এ.এম

চাঁপাইনবাবগঞ্জে কমছে পানি, বাড়ছে ভাঙন: পাঁচ দিনে নদীগর্ভে ২০০ বাড়ি

  • 1:43 pm - October 14, 2026

গোলাম মোস্তফার বয়স ৭০ বছর। গত ১০ বছরে চার বার ভিটে মাটি হারিয়েছেন পদ্মায়। আশা ছিল, আর হয়তো পদ্মার রক্তচক্ষু পড়বে না তার ওপর। তাই ছয় সন্তান নিয়ে ইট দিয়ে পাকা বাড়ি বাঁধেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার দুলর্ভপুর ইউনিয়নের নামোজগন্নাথপুর গ্রামে। পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া ২৫ বিঘা জমির ১০ বিঘা নদীগর্ভে হারিয়ে গেলেও ১৪ বিঘা জমিতে ফসল ফলিয়ে যা আসতো, তা দিয়ে সংসার চলে যেত তাদের। মানসিক প্রতিবন্ধী সন্তানকে নিয়ে অবসর সময় কাটত মোস্তফার। কিন্তু চলতি বছর আকস্মিক পদ্মায় পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে স্রোতের তীব্রতা।

বর্তমানে পদ্মায় পানি কমায় ভাঙনের তীব্রতা আরও বেড়েছে। মাত্র তিনদিনের ব্যবধানে প্রায় অর্ধকিলোমিটার ভেঙে যাওয়ায় বাকি জমি ও বাড়ি হারিয়ে এখন খোলা আকাশের নিচে গোলাম মোস্তফা।

মজ্ঞলবার বিকেলে সেখানে পৌঁছাতেই দেখা গেল পদ্মার বুকে চেয়ে অপলক দৃষ্টিতে বসে তিনি। জানতে চাইলে ক্ষোভের সঙ্গে জানান, এমন ভাঙন আগে তিনি দেখেননি এ এলাকায়। অথচ কোনো জনপ্রতিনিধি বা প্রশাসন তাদের খোঁজ নিচ্ছেন না। চোখের পলকে ১৪ বিঘা জমি নেমে গেল। এখন পরিবার পরিজন নিয়ে কোথায় যাবেন এ নিয়ে চিন্তা তার।

এ অবস্থা শুধু গোলাম মোস্তফার একার নয়। ভারতের ফারাক্কা বাঁধ থেকে মাত্র ১৮ কিলোমিটার ভাটিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্তবর্তী এলাকা এটি। উজানের ঢল ও পদ্মার তীব্র স্রোতে সদর উপজেলার নারায়ণপুর এবং শিবগঞ্জের নামো জগন্নাথপুর, ফিল্টের হাট, বাদশাহ পাড়া, বিসরশিয়া, মোনোহারপুরে চলছে ভাঙন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের অপ্রতুল প্রতিরোধ ব্যবস্থায় বাড়ছে ভাঙন। মাঝে মধ্যে জিও ব্যাগ ফেলা হলেও তা স্থায়ী সমাধান নয়। গত পাঁচ বছরে শিবগঞ্জ উপজেলার ইউনিয়নের ১৫টি গ্রামসহ বিস্তীর্ণ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি বাড়ুক কিংবা কমুক-প্রতি বছরই পদ্মার ভাঙনের শিকার হন এসব এলাকার নদীপাড়ের মানুষ। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি; বরং ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে কয়েকগুণ।

স্থানীয়রা জানান, গত বছর থেকে এ পর্যন্ত ভাঙন রোধে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নদীর স্রোতে একের পর এক বসতভিটা ও ফসলি জমি বিলীন হচ্ছে। এ বছরই দুই উপজেলার পাঁচ শতাধিক বাড়িঘর ও শতাধিক বিঘা ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। হুমকিতে রয়েছে সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা ও বিজিবি ক্যাম্প। ফারাক্কার কাছে হওয়ায় শুধু দুর্লভপুরের বাদশাহপাড়া ও নামোজগন্নাথপুরেই গত পাঁচদিনে ভেঙেছে প্রায় দুইশ বসতবাড়ি। ফলে ক্ষতিগ্রস্তদের অনেকে ফিল্ডের হাট এলাকার একটি বিদ্যালয়ের মাঠে অস্থায়ীভাবে এবং কেউ কেউ খোলা আকাশের নিচে অবস্থান নিয়েছেন।

বর্তমানে ভাঙন আতঙ্কে দিন-রাত কাটছে নদীপাড়ের হাজারো মানুষের। ভাঙন শুরু হলেই মসজিদের মাইকে দেওয়া হচ্ছে ঘর সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা।

পাঁকা ইউনিয়নে ভাঙনের পর ফিল্ডের হাটের বাসিন্দা মেরাজুল ইসলাম জানান, তিন বিঘা জমিসহ বাড়ি নদীতে চলে গেছে। তিন মেয়ে আর ছোট্ট এক ছেলে নিয়ে মাঠে বাস করছেন তিনি। কৃষি জমি হারিয়ে ঢাকায় রাজমিস্ত্রির কাজে গিয়েছিলেন। সেখানে কাজ করার সময় মাচা থেকে পড়ে এখন শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়ে গেছেন। অন্যের সাহায্যে খেয়ে না খেয়ে চলে তাদের সংসার।

নামো জগন্নাথপুর ফিল্ডবাজার এলাকার রাজু আলির আক্ষেপ, তারা সাহায্য বা ভিক্ষা নয়, টেকসই বাঁধ চান। দাদার শত বিঘা জমি সবই পদ্মার পেটে। আগে নিজেরা দিনমজুর খাটালেও এখন নিজেরাই দিনমজুর হয়ে অন্যের কামলা খাটেন। তিনি মোবাইল ফোন মেরামত করেন এবং বাকি দুই ভাই অন্যের জমিতে কামলা খেটে সংসার চালান।.

জগন্নাথ পুর বাদশাহ পাড়ার রুবেল আলী জানান, পদ্মা তীরের অবহেলিত মানুষের পাশে কেউ নাই। দুই উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের কয়েক হাজার মানুষ দুর্ভোগে থাকলেও দেখার কেউ নাই। অন্যান্য বছর তাৎক্ষণিক ভাঙন রোধে জিও ব্যাগ নদীতে ফেললেও এবার সেটাও করা হচ্ছে না। একদিকে স্রোতের তীব্রতা অন্যদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদাসীনতায় তাদের এ দুর্ভোগ।

এদিকে পানি নেমে গেলেই স্থায়ীভাবে নদীভাঙন রোধে কাজ শুরু হবে বলে জানান শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাজহারুল ইসলাম। তিনি আরও বলেন, বন্যার সময় সাধ্যমতো ত্রাণ দেওয়া হয়েছে। যারা ঘরবাড়ি হারিয়েছেন, তাদের পুনর্বাসনের বিষয়েও জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা হয়েছে। এ বিষয়ে লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জানানো হবে।

অপরদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মেহেদী হাসান জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর ও শিবগঞ্জের বিভিন্ন পয়েন্টে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। স্থায়ীভাবে নদীভাঙন ঠেকাতে ৭৪৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। বেশ কয়েকটি প্যাকেজের টেন্ডার সম্পন্ন হয়েছে। পানির লেভেল বেশি থাকায় কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। পানি কমলে দ্রুত কাজ শুরু হবে। তীব্র ভাঙন কবলিত এলাকাগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করা হবে।

অস্থায়ীভাবে জিও ব্যাগ ফেলে নয়, ভিটেমাটি ও অস্তিত্ব রক্ষায় দ্রুত টেকসই ও স্থায়ী নদী রক্ষা বাঁধ নির্মাণের জোর দাবি নদীপাড়ের সহায়-সম্বলহীন জনগণের।

চাঁপাইবার্তা/বিএন।।

স্বত্ব © চাঁপাইবার্তা.কম - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @Softs Cloud