চাঁপাইনবাবগঞ্জ | বুধবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬ - ৩:৫৬ এ.এম

১৮১ অপমৃত্যুর মধ্যে ৭০ আত্মহত্যা, উদ্বেগে চাঁপাইনবাবগঞ্জ

  • 6:39 pm - September 22, 2026

চাঁপাইনবাবগঞ্জে চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ৭০ জন আত্মহত্যা করেছেন। একই সময়ে জেলায় ১৮১টি অপমৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত করেছে পুলিশ। অর্থাৎ এ সময়ে নথিভুক্ত অপমৃত্যুর উল্লেখযোগ্য একটি অংশই আত্মহত্যাজনিত। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, আত্মহত্যার শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের সংখ্যাই বেশি।

পুলিশ বলছে, প্রেমঘটিত বিষয়, পরীক্ষায় ব্যর্থতা, পারিবারিক অশান্তি, দাম্পত্য কলহ, অভিমান, মানসিক চাপ, আর্থিক সংকট ও ঋণের বোঝাসহ নানা কারণে মানুষ চরম হতাশার মধ্যে পড়ছেন। ফলে নথিভুক্ত অপমৃত্যুর উল্লেখযোগ্য একটি অংশই আত্মহত্যাজনিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সংকটে থাকা মানুষের পাশে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে দ্রুত এগিয়ে আসার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে পুলিশ।

৭০টি আত্মহত্যার ঘটনায় ১৮ বছরের কম বয়সী ১৫ জন। ১৯ থেকে ৩০ বছর বয়সী রয়েছেন ২৯ জন। অর্থাৎ ৩০ বছরের নিচেই রয়েছেন ৪৪ জন, যা মোট আত্মহত্যার প্রায় ৬৩ শতাংশ। এ ছাড়া ৩১ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ১২ জন, ৪৬ থেকে ৬০ বছর বয়সী ৯ জন এবং ৬০ বছরের বেশি বয়সী ৫ জন আত্মহত্যা করেছেন।

এই পরিসংখ্যানের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হিসেবে তরুণ ও কিশোরদের সংখ্যা বেশি হওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। জীবনের শুরুতেই নানা ধরনের আবেগ, সম্পর্ক, পড়াশোনা, পারিবারিক প্রত্যাশা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার চাপ অনেকের জন্য সংকট তৈরি করছে বলে মনে করছে পুলিশ।

পুলিশের পর্যবেক্ষণে আত্মহত্যার পেছনে একটি নির্দিষ্ট কারণকে দায়ী করা যাচ্ছে না। কোনো ক্ষেত্রে প্রেমঘটিত বিষয় বা সম্পর্কের টানাপোড়েন, কোথাও পরীক্ষায় ব্যর্থতা, আবার কোথাও পারিবারিক বিরোধ ও দাম্পত্য কলহের মতো বিষয় সামনে এসেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে মানসিক চাপ, আর্থিক সংকট ও ঋণের বোঝা।

বিশিষ্ট সমাজসেবক মনিরুজ্জামান মনিরের মতে কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে কোনো ঘটনা বা পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া সাময়িক হতাশা কখনো কখনো গুরুতর সংকটে রূপ নিতে পারে। অভিভাবকদের অতিরিক্ত প্রত্যাশা, ফলাফল নিয়ে চাপ, সম্পর্কের সমস্যা কিংবা পরিবারের সঙ্গে দূরত্বও তাদের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

এদিকে- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বলছে, আত্মহত্যার আচরণ কোনো একক ঘটনা বা কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। স্বাস্থ্যগত বিষয়, মানসিক চাপ, সম্পর্কের সংকট, আর্থিক সমস্যা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, সহিংসতা ও নানা ধরনের জীবন-সংকট পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

জেলা পুলিশের পরিসংখ্যানে আত্মহত্যার ঘটনায় নারীদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য বলে জানানো হয়েছে। পারিবারিক কলহ, দাম্পত্য অসন্তোষ, মানসিক চাপ ও সামাজিক প্রত্যাশার মতো বিষয় নারীদের একটি অংশের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

অন্যদিকে- পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে আর্থিক সংকট ও ঋণের চাপ হতাশার কারণ হয়ে উঠছে বলে পুলিশের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। ফলে বিষয়টি শুধু মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা হিসেবে দেখলে এর পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। এর সঙ্গে পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাও জড়িত।

সম্প্রতি শিবগঞ্জ উপজেলার নয়ালাভাঙ্গা ইউনিয়নের রসিকনগর গ্রামে পারিবারিক কলহের একটি ঘটনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা সামনে এনেছে।বলতেন সেখানে ৭৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তি পারিবারিক বিরোধের জেরে তার স্ত্রীকে হত্যা করার পর নিজেও আত্মহত্যা করেন।

এরআগে শিবগঞ্জের মনাকষা ও ছত্রাজিতপুর ইউনিয়নেও পারিবারিক কলহের জেরে স্ত্রী হত্যার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনা শুধু আত্মহত্যার প্রবণতা নয়, পারিবারিক সংকট ও সহিংসতার মধ্যকার সম্পর্ক নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এ এন এম ওয়াসিম ফিরোজ বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। একই সঙ্গে সন্তানদের শুধু পরীক্ষার ফলাফল বা পড়াশোনার সাফল্যের দিক থেকে না দেখে তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিও নজর দেওয়ার জন্য অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানান।

তিনি আরও বলেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে সম্মিলিতভাবে সচেতন হতে হবে। কোনো পারিবারিক বিরোধ, মানসিক সংকট বা হতাশার পরিস্থিতি তৈরি হলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের চিত্রটি জাতীয় ও বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গেও সম্পর্কিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি বছর ৭ লাখ ২০ হাজারের বেশি মানুষ আত্মহত্যায় মারা যান। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যা বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। সংস্থাটি বলছে, আত্মহত্যা প্রতিরোধযোগ্য এবং সংকটে থাকা ব্যক্তিকে দ্রুত শনাক্ত করা, সহায়তা দেওয়া ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার আওতায় আনা গুরুত্বপূর্ণ।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস বলেন, একটি ভুল সিদ্ধান্ত বা সাময়িক মানসিক সংকটের কারণে একটি সম্ভাবনাময় জীবন যেন শেষ হয়ে না যায়। শিশু-কিশোরদের আচরণে পরিবর্তন বা হতাশার লক্ষণ দেখা দিলে বকাঝকা না করে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে এবং সহমর্মিতার সঙ্গে কথা বলতে হবে।

আদিনা ফজলুল হক সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ড, মাজহারুল ইসলাম তরু বলেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধে শুধু চিকিৎসা নয় পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও গণমাধ্যমের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক চাপ মোকাবিলার দক্ষতা বাড়ানো, সংকটে থাকা ব্যক্তিকে দ্রুত শনাক্ত করা এবং তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ।

উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জে আট মাসে ৭০টি আত্মহত্যা ও জেলায় ১৮১ অপমৃত্যুর ঘটনা পরিবার ও সমাজের জন্যও একটি সতর্কবার্তা। বিশেষ করে ৩০ বছরের নিচের মানুষের সংখ্যা বেশি হওয়ায় কিশোর-তরুণদের মানসিক চাপ, পারিবারিক সম্পর্ক, শিক্ষাজীবনের সংকট এবং সামাজিক সহায়তার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

চাঁপাইবার্তা/এদিন।।

স্বত্ব © চাঁপাইবার্তা.কম - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @Softs Cloud